ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ৭ - ক্রিয়ার ছয়টি স্তর ও তাদের অনুভূতি
লাহিড়ী মহাশয় যে ক্রিয়াযোগ প্রদর্শন করেছিলেন, তা ছয়টি স্তরে বিভক্ত — প্রথম ক্রিয়া থেকে ষষ্ঠ ক্রিয়া পর্যন্ত। প্রতিটি ক্রিয়াই গুরুর কাছ থেকে শিখে অভ্যাস করতে হয়, এবং প্রতিটি স্তরের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অনুভূতি আছে।
প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি নির্দিষ্ট নামাঙ্কিত সমাধি-অবস্থা আছে, যা সাধকের অভ্যাসের ফলে ক্রমান্বয়ে লব্ধ হয়। এই ছয়টি সমাধির নাম ও তাদের অন্তর্নিহিত অনুভূতি একত্রে দেখা যাক।
প্রথম ক্রিয়া ও শুভেচ্ছা-সমাধি
প্রথম ক্রিয়ার অনুশীলনে সাধকের মন শান্ত হয়ে চৈতন্যে রূপান্তরিত হয়, শরীর সুস্থ হয়, বুদ্ধি উন্নত হয়, এবং সমগ্র মেরুদণ্ড জুড়ে দিব্যজ্যোতি, দিব্যধ্বনি ও দিব্যস্পন্দনের অনুভূতি জাগ্রত হয়। এই স্তরের সমাধির নাম শুভেচ্ছা-সমাধি — শুভেচ্ছা অর্থাৎ আত্মানুশীলনের প্রতি সেই আন্তরিক ইচ্ছা, যা প্রথমবার দিব্যানুভূতির রূপে সাধকের শরীরে প্রতিভাত হয়।
প্রথম ক্রিয়ার অন্তর্গত চারটি পৃথক সাধনরীতি আছে, প্রতিটিরই স্বতন্ত্র ফল:
● প্রথম রীতি (মহামুদ্রা) — এর দ্বারা মন-অহংকার-বুদ্ধি-চিত্ত তথা দেহবোধ ও বিশ্ববোধ দূরীভূত হয়, জ্ঞান বিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়, চিত্ত শান্ত-সাম্য-স্থির হয়ে একনিষ্ঠ ধ্যানে (single-minded meditation) স্থিত হয়। সঙ্গে সঙ্গে সর্বাঙ্গে ভগবানের প্রাণশক্তি ও কম্পনশক্তি অনুভূত হয়, ইষ্টমন্ত্রের অনাহত ধ্বনি স্বতঃই শোনা যায় — মুখে উচ্চারণের প্রয়োজন হয় না — এবং সাধক ব্রহ্মজ্ঞানে ও ব্রহ্মজ্যোতিতে অতি অল্প সময়েই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন।
● দ্বিতীয় রীতি (প্রণাম-সাধনা) — জমি চাষ না করে বীজ বপন করলে যেমন ফলের আশা করা যায় না, তেমনি স্থূল শরীরের মায়া-মোহ-ভ্রান্তি অপসারিত না করে আত্মজ্ঞানের উন্মেষ হয় না। এই রীতির অনুশীলনে দেহের নানা রোগের উপশম হয়, মস্তিষ্কে প্রচুর অক্সিজেন সরবরাহ হয়, স্মৃতি ও ধৃতি বৃদ্ধি পায়, ফলে সাধক সহজেই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেন — এমন আত্মস্থ অবস্থায় কোনো বীভৎসতা মনে জাগতে পারে না।
● তৃতীয় রীতি (প্রাণায়াম ও ঈশ্বরার্পণ) — ফুল-বেলপাতা-ধূপ-দীপ সহযোগে যে পূজা, তা প্রকৃত পূজা নয়; "আমার বলিতে কিছু নাই প্রভু, সকলই তোমারই দান" — এই বোধে অন্তরের ও বাহিরের সমস্ত কিছু, এমনকি আত্মীয়স্বজন পর্যন্ত ভগবানে সমর্পণ করাই প্রকৃত পূজা। তখন উপলব্ধি হয়, আমাদের মস্তিষ্ক-মুখ-হৃদয় প্রকৃতপক্ষে তাঁরই, তিনিই আমাদের মধ্য দিয়ে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন — ভোজনতৃষ্ণা, যৌনকামনা, অর্থবাসনা, হৃদয়কল্পনা সমস্তই তখন ভগবানে অর্পিত হয়, এবং সাধক বিশ্ববোধরহিত, অবাঙ্মনসোগোচর অবস্থায় উপনীত হন।
● চতুর্থ রীতি (যোনিমুদ্রা/জ্যোতিমুদ্রা) — মেরুদণ্ডের মধ্যেই নিহিত থাকে প্রতিটি মানুষের প্রকৃত 'ঠিকুজি-কোষ্ঠি' — ছয় মাস উত্তরায়ণ ও ছয় মাস দক্ষিণায়নের ধারায় বারো রাশি ও গ্রহনক্ষত্রের প্রতীকী উপস্থিতি, যার ভিত্তিতে প্রতিটি মানুষের কর্মসংস্কার অনুযায়ী আকৃতি-প্রকৃতি-জ্ঞান-গুণ-দুঃখ-কষ্ট ভিন্ন ভিন্ন হয়। এই রীতির দ্বারা মনপ্রাণের রূপান্তর ঘটিয়ে ভাগ্য সুপ্রসন্ন করা যায়, গ্রহদোষ দূর হয়, সাম্য-মৈত্রী-করুণা জাগ্রত হয়, শান্ত-দান্ত অবস্থা আসে, মনের যাবতীয় খেয়াল-উদ্বেগ দূরীভূত হয়ে ধৈর্য-দয়া-ক্ষমা-সেবা-প্রেমে চিত্ত পূর্ণ হয়ে যায়। সাধক তখন সমাহিত, উপরত ও বৈরাগ্যযুক্ত হয়ে সমস্ত চক্রবৃত্তি ভগবানে অর্পণ করে দ্বিদলপদ্মের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠিত হতে পারেন।
এছাড়া প্রথম ক্রিয়াতেই খেচরীমুদ্রার অভ্যাসে মন চিন্তাশূন্য হয়, ফলে ক্রিয়াবান সদা আনন্দে অবস্থান করেন, এবং কুণ্ডলিনী মহাশক্তির জাগরণ এই স্তর থেকেই আরম্ভ হয়।
দ্বিতীয় ক্রিয়া ও বিচরণী সমাধি
দ্বিতীয় ক্রিয়ার অনুশীলনে শরীরের প্রতিটি চক্রে পৃথক পৃথক ধ্বনি-জ্যোতি-স্পন্দন অনুভূত হয়। এই অনুভূতি ক্রমশ ঊর্ধ্বগামী হতে হতে প্রতিটি চক্রে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ধ্বনি শ্রুত হয়, এবং যখন এই ধ্বনি-অনুসরণে মেরুদণ্ড বেয়ে মস্তিষ্কে পৌঁছানো যায়, তখন অদৃশ্যলোক থেকে সপ্তবিধ দিব্যধ্বনি এসে মস্তিষ্ককে পূর্ণ করে দেয় এবং সাধক ঈশ্বরবোধে বিভোর হয়ে পড়েন। এই স্তরের সমাধিকে বলা হয় বিচরণী সমাধি। কুম্ভকের সময়সীমাও স্বাভাবিকভাবে, কষ্ট ছাড়াই, বৃদ্ধি পায়; সহস্রারে কুম্ভকরত অবস্থায় চতুর্দিকের দর্শন হয়। এই অবস্থায় উত্তেজনা, বীভৎসতা, ভোগবিলাস, দম্ভ, দর্প, হিংসা, দ্বেষ প্রভৃতি থেকে মন বহু ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, সাম্যভাব জাগ্রত হয়, মেরুদণ্ডের প্রতিটি চক্রের ভাবধারায় ব্রহ্মপ্রতিষ্ঠা ঘটে — ক্রিয়াবান শরীরবোধ ভুলে ব্রহ্মস্বরূপের উপলব্ধি করেন এবং শান্ত-সমাহিত হয়ে স্বরূপানন্দ ভোগ করতে থাকেন।
তৃতীয় ক্রিয়া ও তনুমনসা সমাধি
নিয়মিত ধ্যানাভ্যাসী সাধক তৃতীয় ক্রিয়ার অনুশীলনে তাঁর প্রতিটি পার্থিব অনুভূতির বৃত্তির মধ্যে ভগবৎ-উপলব্ধি ও ভগবৎ-আস্বাদন লাভ করেন। জীবে-শিবে অভেদ ঘটে, রাধা-কৃষ্ণের যুগলমিলন অনুভূত হয় — দেহ রাধা, দেহী কৃষ্ণ, এবং দেহ-দেহীকে একাকার-রূপে উপলব্ধি করাই এই যুগলমিলনের তাৎপর্য। স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে মনকে সহস্রারে রেখে মস্তিষ্কের মধ্যস্থিত সহস্রার চক্রের ঘূর্ণন করতে হয়, জ্যোতি ও ধ্বনি আরও তীব্র হয়, এবং ধ্বনি যত তীব্র হয়, মন তত লীন হতে থাকে। এই স্তরে সাধক অনুভব করেন, আত্মা সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, তিনি যেন বিশ্বচৈতন্যের মহাসমুদ্রে ভাসমান; জাগতিক কর্মকাণ্ডের সময় তাঁর মনে হয় এক বিশেষ শক্তি তাঁর মধ্য দিয়ে কাজ করছে, অথচ তিনি নিজে সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন। এই সমাধিকে বলা হয় তনুমনসা সমাধি — মন তখন আর জীবজগতে বিচরণ না করে অতীন্দ্রিয় জগতে বিচরণ করে, সাধক দিব্যচৈতন্য লাভ করেন এবং উপলব্ধি করেন যে মন-অহংকার-বুদ্ধি ইত্যাদির যা কিছু প্রকাশ, তা সবই আত্মার স্বয়ংপ্রকাশ। একেই বলা হয় কেন্দ্রে স্থিতি — একপ্রকার অন্তর্মুখী (introvert) অবস্থা, যেখানে সাম্য-মৈত্রী-করুণা জাগ্রত হয় এবং সাধক সকলের মধ্যে নিজ অস্তিত্বের উপলব্ধি করে অভেদ অবস্থা লাভ করেন।
চতুর্থ ক্রিয়া ও অসংসক্তি সমাধি
চতুর্থ ক্রিয়ার অনুশীলনকালে সাধক পালস্, থ্যালেমাস, হাইপোথ্যালেমাস, পিনিয়াল ও পিটুইটারি গ্রন্থিসমূহের মধ্যে আত্মার বিশেষ স্পন্দন অনুভব করেন। তাঁর মনে হয়, একটি জ্যোতি মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে — কুম্ভকসহ মনকে সহস্রারে রেখে এই ঘূর্ণন প্রক্রিয়া চলতে থাকে, শুভ্র জ্যোতি সহস্রার থেকে নির্গত হয়ে মহাকাশের সঙ্গে মিলিত হচ্ছে এমন উপলব্ধি হয়। এই স্তরের সমাধিকে বলা হয় অসংসক্তি সমাধি — সাধক তখন সাম্যে সংলীন হয়ে নির্দোষ অবস্থায় উপনীত হন, নিম্নবৃত্তিসমূহকে সম্পূর্ণরূপে বলিদান করে সর্বত্র ভগবানের উপস্থিতি উপলব্ধি করেন; ক্রিয়াবানের মন সদা ঊর্ধ্বে বিচরণ করে, শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি অত্যধিক কমে যায়, মধ্যে মধ্যে শরীরবোধ লুপ্ত হয়ে যায় — একেই এই স্তরের প্রাণায়াম বলা হয়।
পঞ্চম ক্রিয়া ও সত্তোৎপত্তি সমাধি
পঞ্চম ক্রিয়ায় সাধক লঘুমস্তিষ্কে (cerebellum) দিব্যানুভূতি লাভ করেন। তিনি ক্রমে পিনিয়াল গ্রন্থির সন্নিকটে উপনীত হন এবং তার অভ্যন্তরে প্রবেশের যথাসাধ্য প্রয়াস করেন। এই অবস্থাকে বলা হয় সত্তোৎপত্তি সমাধি — সত্তা অর্থাৎ পরম সত্তা বা পরমাত্মার উপলব্ধির উন্মেষ। এই স্তরে দীর্ঘ শ্বাস গ্রহণের পর যথাসম্ভব কুম্ভকে থাকতে হয়; সাধক দীর্ঘসময় শ্বাসপ্রশ্বাস ছাড়াই সহজে থাকতে পারেন। শরীরবোধ থাকলেও মন কূটস্থে অবস্থান করে — এ প্রাণায়াম ও একাগ্রতার তীব্রতম অবস্থা, যেখানে সাধক ব্যষ্টিসত্তা থেকে ক্রমে সমষ্টিসত্তার উপলব্ধির দিকে অগ্রসর হন।
ষষ্ঠ ক্রিয়া ও পরাবস্থা
ষষ্ঠ ক্রিয়ায় বিশেষ শ্বাসপ্রক্রিয়ায় পূরক ও রেচক করতে হয়, কুম্ভক থাকে না — পাঁচ-ছয় বার, সম্ভব হলে সাত থেকে দশবার ক্রমান্বয়ে পূরক-রেচক অভ্যাসের পর সাধক পরাবস্থা লাভ করেন। পূর্ববর্তী পাঁচটি ক্রিয়ার সমাধিগুলি — শুভেচ্ছা, বিচরণী, তনুমনসা, অসংসক্তি ও সত্তোৎপত্তি — এই স্তরে এসে যেন একীভূত হয়ে যায়, এবং সাধক ছয়টি ক্রিয়ার সমাপ্তিতে চূড়ান্ত মুক্তির দ্বারপ্রান্তে উপনীত হন।
গ্রন্থে বলা হয়েছে, "ক্রিয়াযোগ এমন এক প্রদীপশিখা, যার দীপ্তি পাপী বা পুণ্যবানের ভেদ করে না" — অর্থাৎ এই বিজ্ঞান সর্বজনের জন্য উন্মুক্ত, পাত্রতা যাচাই না করেই এর দ্বার সকলের সামনে খোলা।


