ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ৮ - কেন গুরু অপরিহার্য — বিজ্ঞানসম্মত কারণ
এখানে একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে — যদি এ এতই বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি, তবে কেন এটি কোনো গ্রন্থে সম্পূর্ণরূপে বর্ণনা করে সাধারণ মানুষকে স্বাধীনভাবে অভ্যাস করতে দেওয়া হয় না? এর উত্তরও বিজ্ঞানসম্মত।
চক্রজাগরণ ও কুণ্ডলিনী উত্থান একটি সূক্ষ্ম ও শক্তিশালী প্রক্রিয়া। ভ্রান্ত পদ্ধতিতে বা অপ্রস্তুত শরীর-মনে এই প্রক্রিয়া শুরু করলে বিপদ ঘটতে পারে — শারীরিক (অত্যধিক তাপ, স্নায়বিক সমস্যা), মানসিক (অস্থিরতা, বিভ্রম), অথবা আধ্যাত্মিক (অহংবৃদ্ধি, সিদ্ধিতে আসক্তি)। সাধারণ মানুষের শরীর একটি পঞ্চাশ ওয়াটের বাতির মতো, যা ক্রিয়ার অত্যধিক অভ্যাসে জাগ্রত বিপুল শক্তি ধারণ করতে পারে না। তাই ক্রমিক ও নিয়মিত বৃদ্ধির মাধ্যমেই শরীরকে প্রস্তুত করতে হয় — প্রাথমিক সাধক দিনে দুইবার মাত্র চোদ্দ থেকে আঠাশ বার ক্রিয়া অভ্যাস করেন, ধীরে ধীরে শরীর-মন যখন এই শক্তি ধারণে সক্ষম হয়, তখন অভ্যাসের মাত্রা বাড়ে।
শাস্ত্রে বারবার বলা হয়েছে, এই সাধনা অবশ্যই সদ্গুরুর তত্ত্বাবধানে করতে হবে। গুরু জানেন শিষ্যের শরীর-মন-প্রাণ কতটা প্রস্তুত, কোন চক্রে কাজ করা নিরাপদ, এবং কতটা শক্তির জাগরণ সহনীয়। তাঁরা ক্রমানুসারে শিষ্যকে প্রস্তুত করেন — প্রথমে যম-নিয়মের দ্বারা নৈতিক ভিত্তি, তারপর আসনের দ্বারা শারীরিক স্থিরতা, প্রাণায়ামের দ্বারা প্রাণশক্তি নিয়ন্ত্রণ, প্রত্যাহারের দ্বারা ইন্দ্রিয়সংযম, এবং তারপরই ধারণা-ধ্যান-সমাধির উচ্চতর স্তরে। হঠযোগপ্রদীপিকায় বলা হয়েছে — শরীরশুদ্ধি ব্যতীত প্রাণায়াম বিপজ্জনক। দীক্ষার সময় গুরু শিষ্যকে কেবল কৌশল শেখান না, একটি আধ্যাত্মিক সংযোগও দান করেন, যা সাধনায় অপরিহার্য।
এইভাবে তত্ত্ব ও সাধনা, জ্ঞান ও অনুশীলন, শাস্ত্র ও অভিজ্ঞতা — সবকিছু একসূত্রে গ্রথিত হয়ে ক্রিয়াযোগের পূর্ণতা আনে। কারণ সাধনা ব্যতীত তত্ত্ব নিষ্ফল, আর তত্ত্ব ব্যতীত সাধনা অন্ধ।


