মহামহোপাধ্যায় গোপীনাথ কবিরাজ _ বিদ্যাপরম্পরার ইতিহাস এবং একটি অন্তর্জীবনের সাধনাপথ

কিছু মানুষের জীবনকে শুধু জীবনী বলে বোঝা যায় না। তাঁদের জীবন একই সঙ্গে একটি বিদ্যাপরম্পরার ইতিহাস এবং একটি অন্তর্জীবনের সাধনাপথ। মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিতপ্রবর ব্রহ্মর্ষি গোপীনাথ কবিরাজ ছিলেন তেমনই একজন। সংস্কৃতশাস্ত্রের পণ্ডিত, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য জ্ঞানের গবেষক, অধ্যাপক, দার্শনিক এবং সাধক—তাঁর পরিচয়ের এই প্রতিটি দিক সত্য। কিন্তু তাঁর জীবনের আসল বৈশিষ্ট্য সম্ভবত অন্যত্র। তিনি জ্ঞানকে কেবল অর্জন করেননি; জ্ঞানের ভিতর দিয়েই সত্যের দিকে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।১৮৮৭ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, ২২ ভাদ্র ১২৯৪ বঙ্গাব্দে, ঢাকা জেলার ধামরাইয়ে মাতুলালয়ে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা বৈকুণ্ঠনাথ কবিরাজ ছিলেন সংস্কৃতের কৃতী ছাত্র। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে অনার্স নিয়ে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। কিন্তু পুত্রের জন্মের কয়েক মাস আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। মা-ও অল্প বয়সেই বিধবা হন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই গড়ে ওঠে গোপীনাথের শৈশব।অভাব তাঁকে থামাতে পারেনি। বরং অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে তৈরি হয় এক অসাধারণ পাঠস্পৃহা। পাণিনীয় ব্যাকরণ, সিদ্ধান্তকৌমুদী, মহাভাষ্যের মতো কঠিন সংস্কৃত গ্রন্থের পাশাপাশি তিনি পড়ছিলেন মিল্টন, শেক্সপিয়র, বায়রন, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, ব্রাউনিং, এমারসনদের। বইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল নিছক ছাত্রের সম্পর্ক নয়। স্মৃতিচারণে পাওয়া যায়, বই পড়তে বসে তিনি কখনও কখনও স্নান-আহার পর্যন্ত ভুলে যেতেন। একবার শ্বশুরবাড়িতে তাঁকে খুঁজে না পেয়ে সবাই যখন উদ্বিগ্ন, তখন দেখা গেল তিনি গ্রন্থাগারে বসে গভীর মনোযোগে বই পড়ছেন। এই একাগ্রতা পরবর্তী জীবনে তাঁর সমস্ত কাজের ভিত হয়ে দাঁড়ায়।স্বাস্থ্যের কারণে ঢাকায় পড়াশোনা চালানো সম্ভব না হলে তিনি জয়পুর মহারাজার কলেজে ভর্তি হন। সেখানে কোনও পরিচিত আশ্রয় বা আর্থিক নিশ্চয়তা ছিল না। নিজের উদ্যোগে থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করেন, প্রয়োজনে গৃহশিক্ষকের কাজও করেন। সেখানেই তাঁর প্রতিভা শিক্ষকদের নজরে আসে।ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক নবকৃষ্ণ রায় তাঁর ব্রাউনিং-বিষয়ক একটি প্রবন্ধ পড়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে মন্তব্য করেছিলেন—“I could not have written better than this.”১৯১০ সালে তিনি কাশীর কুইন্স কলেজে এম.এ. পড়তে আসেন। এখানেই তাঁর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ডঃ আর্থার ভেনিস। ভেনিস তাঁকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে আটকে রাখেননি। প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে তিনি ন্যায়শাস্ত্র, পালি, প্রাকৃত, লিপিবিদ্যা, মুদ্রাবিজ্ঞান, ফরাসি ও জার্মান ভাষা অধ্যয়নের সুযোগ পান। ভারতীয় শাস্ত্রের পাশাপাশি ইউরোপীয় গবেষণার পদ্ধতির সঙ্গেও তাঁর পরিচয় গভীর হয়।১৯১৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ. পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম হন। পরীক্ষক ডঃ ভাণ্ডারকর তাঁর বিস্তৃত জ্ঞান দেখে বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন। এই সাফল্যের পর বিভিন্ন জায়গা থেকে তাঁর কাছে চাকরির প্রস্তাব আসতে শুরু করে। কিন্তু গোপীনাথের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়টি সেখানেই অন্যরকম হয়ে ওঠে।লাহোর ও আজমীর থেকে অধ্যাপনার প্রস্তাব এসেছিল। তিনি গ্রহণ করেননি। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যেতে স্বয়ং কাশীতে এসেছিলেন। লক্ষ্ণৌ বিশ্ববিদ্যালয়ও তাঁকে অধিক বেতনে নিতে চেয়েছিল। পরবর্তীকালে অক্সফোর্ড থেকেও অধ্যাপনার প্রস্তাব আসে। তিনি কোনওটিই গ্রহণ করেননি।বারাণসীয় সংস্কৃত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তাঁকে প্রথম উপাচার্য হওয়ার জন্যও আহ্বান জানানো হয়েছিল। সেই পদও তিনি নেননি। তবে তিনি কর্মজীবন থেকে সরে যাননি। ১৯২৪ সালে কাশী রাজকীয় সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। কিন্তু ১৯৩৭ সালে নির্ধারিত সময়ের বহু আগেই অবসর নেন। এর ফলে তাঁর আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল প্রায় সওয়া লক্ষ টাকা।এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য তাঁর নিজের জীবনদর্শনের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। তিনি জীবনে কী পাবেন, তার চেয়ে সময়টি কী কাজে ব্যয় করবেন—এই প্রশ্নটিই তাঁর কাছে বড় ছিল। গবেষণা, শাস্ত্রচর্চা এবং সাধনার জন্য সময় তাঁর কাছে কোনও পদ বা আর্থিক সুবিধার চেয়ে মূল্যবান হয়ে উঠেছিল।গোপীনাথ কবিরাজের বিদ্যার পরিধি ছিল বিস্ময়কর। যোগ, তন্ত্র, শৈবাগম ও বৌদ্ধদর্শনের প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল; পাশাপাশি ন্যায়, বেদান্ত, সাংখ্য, ব্যাকরণ, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব ও সাহিত্যেরও গভীর অধ্যয়ন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর পাণ্ডিত্যের বিশেষত্ব শুধু বিস্তারে নয়—দৃষ্টিভঙ্গিতে।শাস্ত্রে আপাত বিরোধ দেখলে তিনি একটি মতকে সত্য আর অন্যটিকে মিথ্যা বলে থেমে যেতেন না। তাঁর অনুসন্ধান ছিল—কোন বৃহত্তর সত্যের মধ্যে এই ভিন্ন বক্তব্যগুলি নিজেদের স্থান পেতে পারে। এই সমন্বয়দৃষ্টি তাঁর গবেষণাকে সংকীর্ণ মতবাদ থেকে দূরে রেখেছিল।আর তাঁর শিক্ষাদানের মধ্যেও ছিল একই মনোভাব। একটি কিশোরীকে জ্যামিতির উপপাদ্য বোঝানোর সময় যেমন ধৈর্য ধরে বারবার ব্যাখ্যা করতেন, তেমনই প্রবীণ পণ্ডিতদের সঙ্গে ন্যায়, সাংখ্য বা ব্রহ্মসূত্র নিয়ে গভীর আলোচনায় বসতেন। প্রশ্নকারী না বুঝলে তিনি বিরক্ত হতেন না। কারণ তাঁর কাছে পাণ্ডিত্য ছিল অন্যকে পরাস্ত করার উপায় নয়; সত্যের কাছে পৌঁছনোর একটি সম্মিলিত প্রয়াস।গোপীনাথের জীবনে বিদ্যার পাশাপাশি সাধনার আকর্ষণও ছিল শৈশব থেকেই। ধামরাইয়ের কীর্তন, ভাগবতপাঠ ও সাধুসঙ্গ তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেন শ্রীশিবরামকিঙ্কর যোগত্রয়ানন্দ এবং যোগিরাজ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংস। আর তাঁর বিদ্যাজীবনের অন্যতম প্রধান গুরু ছিলেন ডঃ আর্থার ভেনিস।তিনজনের ভূমিকা ছিল আলাদা—ভেনিস তাঁকে দিয়েছিলেন গবেষণার শৃঙ্খলা।যোগত্রয়ানন্দ দিয়েছিলেন আধ্যাত্মিক শিক্ষার দিশা।বিশুদ্ধানন্দের কাছে তিনি গ্রহণ করেছিলেন দীক্ষা।১৯১৮ সালের ২১ জানুয়ারি স্বামী বিশুদ্ধানন্দ পরমহংসের কাছে তাঁর দীক্ষা হয়।এরপর তাঁর জীবনে শাস্ত্রচর্চা ও সাধনা আর দুটি পৃথক পথ রইল না। দিনের একদিকে গবেষণা ও অধ্যাপনা, অন্যদিকে গুরুসঙ্গ ও সাধনা—দুটি ধারা ক্রমে একই অন্তঃস্রোতে মিলিত হতে থাকে।গোপীনাথ কবিরাজের সাধনাচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ছিল ‘অখণ্ড মহাযোগ’। এই ধারণার সবিস্তৃত ব্যাখ্যা গুহ্য ও সাধনানির্ভর; তিনি নিজেও এর সমস্ত দিক সর্বসাধারণের সামনে প্রকাশ করেননি। তাঁর রচনায় অবশ্য এর তাত্ত্বিক কিছু দিকের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এর একটি কেন্দ্রীয় ভাব হল মানুষের পুরুষকার এবং ঈশ্বরীয় অনুগ্রহের সম্পর্ক।মানুষের সাধনা ঊর্ধ্বমুখী প্রয়াস; অন্যদিকে পরমের করুণা যেন উপর থেকে নেমে আসে। পূর্ণতার জন্য প্রয়োজন এই দুইয়ের মিলন। অর্থাৎ সাধনা শুধু নিজের শক্তির প্রদর্শন নয়, আবার কৃপাও নিষ্ক্রিয় অপেক্ষার অজুহাত নয়। মানুষকে প্রস্তুত হতে হয়।এই অপেক্ষাকে চাতকের অপেক্ষার সঙ্গে তুলনা করা যায়—যে অপেক্ষা নিছক বসে থাকা নয়, বরং নিজেকে সেই মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত রাখা।১৯২৮ সালে শ্রীশ্রীমা আনন্দময়ী কাশীতে এলে গোপীনাথ কবিরাজের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্ক গভীর শ্রদ্ধা, স্নেহ ও আত্মসমর্পণের রূপ নেয়। ১৯৩৫ সালে স্বামী বিশুদ্ধানন্দের আশ্রমে মা আনন্দময়ী ও স্বামীজীর সাক্ষাতের একটি স্মৃতিচিত্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেখানে যোগ, মায়া ও সূর্যবিজ্ঞানের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কিছু অলৌকিক বিবরণও পাওয়া যায়; সেগুলিকে আমরা সমসাময়িক স্মৃতিচারণ হিসেবেই গ্রহণ করতে পারি, প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়। স্বামী বিশুদ্ধানন্দের দেহাবসানের পর গোপীনাথের জীবনে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রয় আরও গভীর হয়ে ওঠে।তাঁর চিঠিতে এই সম্পর্কের একটি অপূর্ব দিক প্রকাশ পায়। তিনি নিজেকে মায়ের কোলে থাকা শিশুর সঙ্গে তুলনা করেছেন—যে মণিমুক্তা চায় না, মায়ের প্রসন্ন মুখের অপেক্ষায় থাকে।এই শিশুভাবের মধ্যে তাঁর সাধনার একটি গভীর সত্য ধরা পড়ে। সারাজীবন যিনি শাস্ত্রের কঠিনতম প্রশ্ন নিয়ে চিন্তা করেছেন, শেষ পর্যন্ত তিনিই নিজের সমস্ত পাণ্ডিত্যকে সরিয়ে রেখে আশ্রয়প্রার্থী হতে পেরেছিলেন।জীবনের শেষ পর্বে ব্যক্তিগত শোকও তাঁকে স্পর্শ করেছে। ১৯৬৯ সালে সহধর্মিণী কুসুমকামিনী দেবীর মৃত্যু হলে তিনি আনন্দময়ী মায়ের আশ্রমে চলে আসেন। মায়ের কন্যাপীঠের কুমারীরা তাঁর সেবায় যুক্ত হন।এই সময় তাঁর জীবন আরও অন্তর্মুখী হয়ে ওঠে।তাঁর জীবনে নানা আশ্চর্য অভিজ্ঞতার কথাও সমসাময়িকদের স্মৃতিতে পাওয়া যায়—অসাধারণ স্মৃতিশক্তি থেকে শুরু করে যোগসাধনা-সম্পর্কিত নানা ঘটনা। কিন্তু তাঁর মহত্ত্ব প্রমাণ করার জন্য এসব কাহিনির প্রয়োজন নেই। তাঁর জীবন নিজেই যথেষ্ট।একজন মানুষ একই সঙ্গে এতগুলি শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন, আধুনিক গবেষণার সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রপরম্পরার সংলাপ ঘটিয়েছেন, উচ্চপদ ও আর্থিক সুবিধা প্রত্যাখ্যান করেছেন, এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত সাধনা ও গুরুপরম্পরার প্রতি নিবেদিত থেকেছেন—এই সমন্বয়ই তাঁকে বিরল করে তোলে।১৯৭৬ সালের ১২ জুন, শনিবার, বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে কাশীতে তাঁর দেহাবসান ঘটে।তাঁর জীবনে সম্মানের অভাব ছিল না—মহামহোপাধ্যায় উপাধি, পদ্মবিভূষণ, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি. লিট., সাহিত্যিক সম্মান এবং বিভিন্ন বিদ্বৎসমাজের স্বীকৃতি তাঁর প্রাপ্তির তালিকায় রয়েছে।কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকার কোনও পুরস্কারের তালিকায় শেষ হয় না।তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি পুরনো ভারতীয় আদর্শকে নতুন করে হাজির করে—বিদ্যা যদি সত্যিই গভীর হয়, তবে তা একসময় মানুষকে নিজের সীমার মুখোমুখি দাঁড় করায়।শাস্ত্র থেকে তত্ত্বে, তত্ত্ব থেকে সাধনায়, আর সাধনা থেকে আত্মসমর্পণে—গোপীনাথ কবিরাজের জীবনের গতিপথকে হয়তো এই কয়েকটি শব্দেই সবচেয়ে সংক্ষেপে ধরা যায়।প্রাচীন বাণীটি তাই তাঁর স্মরণে বিশেষ অর্থ পায়—“অপার-সম্বিৎসুখ-সাগরে’স্মিন্লীনং পরে ব্রহ্মণি যস্য চেতঃ।”যাঁর চিত্ত পরব্রহ্মের অসীম জ্ঞানানন্দের সাগরে লীন—তাঁর জীবন শুধু একজন পণ্ডিতের জীবন নয়।তা হয়ে ওঠে একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ—আমরা যে জ্ঞান অর্জন করি, শেষ পর্যন্ত সেই জ্ঞান আমাদের কী করে তোলে?আরও জ্ঞানী?নাকি আরও বিনম্র?গোপীনাথ কবিরাজের জীবন দ্বিতীয় সম্ভাবনাটির দিকেই ইঙ্গিত করে।
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on September 08, 2026 05:44
No comments have been added yet.