ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ৩ - একটি সুপ্রাচীন বিজ্ঞানের পুনরুত্থান
ক্রিয়াযোগ কোনো নতুন উদ্ভাবিত পদ্ধতি নয় — এ এক সুপ্রাচীন সাধনবিজ্ঞানের পুনরুত্থান। মহাবতার বাবাজী মহারাজ স্বয়ং লাহিড়ী মহাশয়কে বলেছিলেন, "উনবিংশ শতাব্দীতে তোমার মাধ্যমে আমি জগৎকে যে ক্রিয়াযোগ প্রদান করছি, তা সেই বিদ্যারই পুনরুজ্জীবন, সহস্র বৎসর পূর্বে যা কৃষ্ণ অর্জুনকে দিয়েছিলেন, এবং যা পরবর্তীকালে পতঞ্জলি, খ্রিস্ট, সেন্ট জন, সেন্ট পল এবং তাঁদের অন্যান্য শিষ্যদের জানা ছিল।" এই একটি বাক্যেই বোঝা যায়, ক্রিয়াযোগ কোনো একটিমাত্র সম্প্রদায় বা কালের সম্পত্তি নয় — এ এক সর্বজনীন, সনাতন বিজ্ঞান, যা কালে কালে বিস্মৃত হয়ে যায়, আবার কোনো যুগে কোনো মহাপুরুষের মাধ্যমে পুনরায় প্রকাশিত হয়।
ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায়ে, জ্ঞানযোগে, আমরা পাই —
অপানে জুহ্বতি প্রাণং প্রাণেঽপানং তথাপরে। প্রাণাপানগতী রুদ্ধ্বা প্রাণায়ামপরায়ণাঃ॥ (গীতা ৪/২৯)
অর্থাৎ, অন্য যোগীগণ অপানবায়ুতে প্রাণবায়ু এবং প্রাণবায়ুতে অপানবায়ুর আহুতি দিয়ে, প্রাণ ও অপানের গতি রুদ্ধ করে প্রাণায়ামপরায়ণ হন। এই শ্লোকেই ক্রিয়াযোগের মূল প্রক্রিয়ার আভাস নিহিত আছে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে, ধ্যানযোগে, শ্রীকৃষ্ণ পুনরায় বলছেন —
সমং কায়শিরোগ্রীবং ধারয়ন্নচলং স্থিরঃ। সম্প্রেক্ষ্য নাসিকাগ্রং স্বং দিশশ্চানবলোকয়ন্॥ (গীতা ৬/১৩)
মেরুদণ্ড, গ্রীবা ও মস্তক সরল ও নিশ্চলভাবে ধারণ করে, নাসিকাগ্রে দৃষ্টি স্থির রেখে, কোনো দিকে না তাকিয়ে যোগী স্থির থাকবেন — এই যে আসনস্থিতি ও দৃষ্টিস্থিরতার নির্দেশ, তা আজও প্রতিটি ক্রিয়াসাধকের অনুশীলনের প্রথম ধাপ।
মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রে অষ্টাঙ্গযোগের কথা বলেছেন — যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। ক্রিয়াযোগের একটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য এই যে, এই অষ্টাঙ্গের প্রতিটি স্তর ক্রমানুসারে পার না করেও, গুরুকৃপায় একজন নিষ্ঠাবান ক্রিয়াবান নির্বিকল্প সমাধি লাভ করতে পারেন, যা পতঞ্জলি-প্রণীত যোগদর্শনের সর্বোচ্চ পর্যায়। এই কারণেই পরমহংস হরিহরানন্দ বলেছিলেন, ক্রিয়াযোগ পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রের শেষ চারটি অঙ্গ দিয়ে গঠিত — প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি। সদ্গুরুর কাছে ক্রিয়াযোগে দীক্ষিত হলে অত্যল্প সময়েই সাধকের কুলকুণ্ডলিনী শক্তি জাগ্রত হয়।
শ্রীযুক্তেশ্বরজী এই বিজ্ঞানের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন, "ক্রিয়াযোগ এমন এক উপকরণ, যার মাধ্যমে মানুষের বিকাশকে ত্বরান্বিত করা যায়। প্রাচীন যোগীরা আবিষ্কার করেছিলেন যে মহাচৈতন্যের গুপ্ত রহস্য শ্বাস-নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এ বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারে ভারতের অনন্য ও অমর অবদান।" এই একটি বাক্যে যোগবিজ্ঞানের গোটা দর্শনটি ধরা পড়ে — শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ শুধু শরীরের নয়, চেতনার নিয়ন্ত্রণ।
কেন এই বিদ্যা লুপ্ত হয়েছিল, কেন তা প্রয়োজন হয়েছিল পুনরুদ্ধারেরকঠোপনিষদে আমরা পাই —
যদা সর্বে প্রভিদ্যন্তে হৃদয়স্যেহ গ্রন্থয়ঃ। অথ মর্ত্যোঽমৃতো ভবত্যেতাবদ্ধ্যনুশাসনম্॥ (কঠোপনিষদ্ ২/৩/১৫)
যখন হৃদয়ের সমস্ত গ্রন্থি ছিন্ন হয়, তখন মর্ত্য মানুষ অমৃত হয়ে ওঠে। বেদান্তের ভাষায় এই ত্রিগ্রন্থি হলো অবিদ্যা, কাম ও কর্ম — অজ্ঞান, বাসনা ও কর্মবন্ধন। এই গ্রন্থিত্রয় ছেদন করাই যোগসাধনার লক্ষ্য, এবং এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি প্রাচীন ঋষিরা জানতেন। কিন্তু কালক্রমে, যেমন প্রতিটি গভীর বিদ্যারই ভবিতব্য, এই সাধনপদ্ধতি ক্রমে লুপ্ত হয়ে যায় — কেবল তত্ত্বকথা অবশিষ্ট থাকে, প্রকৃত সাধনপক্ষ হারিয়ে যায়। মানুষ শাস্ত্র পাঠ করে, তর্ক করে, কিন্তু সেই তর্ক-শাস্ত্রজালেই বিমোহিত হয়ে থাকে। ভগবান মহাদেব যোগবীজে বলেছেন —
অনেকশতসংখ্যাভিস্তর্কব্যাকরণাদিভিঃ। পতিতা শাস্ত্রজালেষু প্রজ্ঞয়া তে বিমোহিতাঃ॥ (যোগবীজ, ৮)
শত-শত তর্কশাস্ত্র ও ব্যাকরণাদির অনুশীলন করে মানুষ শাস্ত্রজালে পতিত হয়ে কেবল বিমোহিত হয়। প্রকৃত জ্ঞান যোগাভ্যাস ব্যতীত উৎপন্ন হয় না। এই কারণেই প্রয়োজন হয়েছিল এমন একজন মহাপুরুষের, যিনি এই লুপ্ত সাধনপক্ষকে পুনরুদ্ধার করে মানবজাতির সামনে উন্মুক্ত করবেন। সেই মহাপুরুষই হলেন যোগিরাজ শ্রীশ্রীশ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়। ঠিক যেমন ভগীরথ গঙ্গাকে হিমালয় থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে এনেছিলেন, তেমনই লাহিড়ী মহাশয় ক্রিয়াযোগ সাধনাকে পুনরায় হিমালয় থেকে নিম্নভূমিতে বহন করে এনেছিলেন।
এখানেই আমাদের আলোচনার দ্বিতীয় পর্বে প্রবেশ করার সময় এসেছে — কীভাবে, কাদের হাত ধরে এই পথ পুনরুজ্জীবিত হলো।


