জার্নাল-০৮

পৃথিবীর সমস্ত গল্পের জন্ম হয় একটি মাত্র সরল বিশ্বাস থেকেঃ অন্য মানুষেরা ঠিক আমার মতোই, তারা ঠিক আমার মতো করেই ভাবে।

বিশ্বাসটা মাত্রাতিরিক্ত সরল, শিশুতোষও বলা যায় সেটাকে। কিন্তু, অনুভব করি, সাহিত্য কখনোই ঠিক শিশুতোষ ব্যাপার নয় আমার কাছে। সাহিত্য একরকম প্রতিবাদ।

যা যা আমরা পাইনি জীবনে, আমাদের যেখানে যেখানে অপমান, যারা যারা দুর ছাই করলো আমাদের; তার সমস্ত কিছুর জবাব দেয়ার জন্যে সাহিত্যকেই একমাত্র অস্ত্র বলে বোধ হয় আমার। জীবন মানুষ কেবল যাপন করে না, জীবনে তাকে অংশও নিতে হয়। দরজা বন্ধ করে লেখার টেবিলে বসলে তাই আবিষ্কার করতে পারি, জীবনের কাঁটাকম্পাস গত কয়েক বছরে এমন সরে এসেছে, যে সেখানে অংশ নিতে হলে লেখার বাইরে আর কিছু করে ওঠবার সামর্থ্য আমার নাই। অল্প সময়ের জন্য ম্লান মনোরম, আর বাকিটা সময়ে মনোটোনাস মাদারচোত হয়ে থাকা দুনিয়া এমনই অসহনীয়, যে সেটার ভার বহনের জন্য আমার একমাত্র উপায় অক্ষর দিয়ে তাকে সম্পাদনা করা।

মহামারীর কালে দরজা বন্ধ করে যে মন দিয়েছে দামড়া সব উপন্যাস পড়ায়, খেয়াল করলে সে আবিষ্কার করতে পারবে যে অতীত বা বর্তমানের বুকে শ্বাস টেনে নেওয়া লেখকেরা কী অকারণ শক্তিক্ষয়টাই না করেছে লিখতে গিয়ে। অক্ষর আর শব্দে যে জগৎ তারা গড়তে চেয়েছে, পেট্রোডলার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং এর পৃথিবীতে সেটি কী ভীষণ অপাংক্তেয়! যা লেখা হয় বহু বছরে, তা উড়িয়ে দেয়া যায় মুহুর্তেই। যা লিখতে গিয়ে লেখক অগ্রাহ্য করে অন্য অজস্র প্রলোভন, জীবন তাকে কখনোই সেই আনন্দ ফিরিয়ে দেয় না দ্বিতীয়বার। লেখক যখন ভাবে যে একটা দারুণ অর্থবহ আর মহৎ কিছু সে করে উঠছে; জীবন তখন ল্যাং মেরে তাকে দিয়ে করিয়ে নেয় জঘন্য সব ভুল।

প্রতিটি বৃহৎ ইমারতের মতোই, প্রতিটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যও তাই লুকিয়ে রাখে কোনো ক্ষত। গুডরিডসের পাতায় তারা দাগাতে আসা আঙুল তাই থমকে যায় হঠাৎ। দরজার ওপাশে লেখকের যে দহন, সেটার জ্বালানি পোড়ার হার নির্ণয় করবে, এমন এলপগরিদম কোথায়?

অকারণ এই অস্তিত্ববাদী ভাবনা বড্ড অকারণ, জানি। মাইকের সামনে গলা কাঁপানো ভাষণের মতোও মনে হতে পারে এসব কথা, সেটাও মানি। কিন্তু সাহিত্য তো ঠিক ভাষণ দিয়ে যাওয়া নয় আমার কাছে। সাহিত্য, নিজের ভেতরে আজীবন কোনো রুপকথা লালন করবার মতো ব্যাপার।

আমি জানি এই ভাবনা শিশুতোষ। কিন্তু পেট্রোডলার, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আর সোশ্যাল ডিস্ট্যানসিং-এর প্রতিবাদী পৃথিবীতে, শিশুর মতো মন নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আশ্রয় সাহিত্য ছাড়া আর কোথায় আছে?
17 likes ·   •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on June 04, 2020 09:37
No comments have been added yet.